1. nagorikit@gmail.com : দৈনিক সময়ের বার্তা : Nagorik IT
  2. admin@doiniksomoyerbarta.com : Admin1 :
  3. mdjoy.jnu@gmail.com : Editor :
বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন
  •                      

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বাংলাদেশ

মো. মারুফ হোসেন
  • আপডেট করা হয়েছে বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৪
  • ৫০ বার পড়া হয়েছে

গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদ গাইতাম/ আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম। হিন্দুগো বাড়িতে যাত্রা গান হইতো, নিমন্ত্রণ দিত আমরা যাইতাম- বাউল শিল্পী শাহ্ আব্দুল করিমের এই গানের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি প্রাচীন কাল থেকেই বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিদ্যমান।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বলতে বোঝায় সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, গোষ্টি,লিঙ্গ এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে আস্থা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। হাজার বছরের সম্প্রীতির ইতিহাস রয়েছে এ বাংলার। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, চাকমা, গারো, সাওতাল, ইত্যাদি জাতি সত্ত্বার মানুষ একই আত্মায় বসবাস করে যেন একই মায়ের সন্তান। এদেশের অধিবাসীরা বাঙালী, মারমা, গারো, সাওতাল, চাকমা, মনিপুরী জাতিসত্তায় বিভক্ত হলেও আমাদের একক পরিচয় হলো আমরা বাংলাদেশি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, বাংলা আমার মা হলে, বিভিন্ন জাতি সত্ত্বার মানুষ হলো তার সন্তান।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কারণে এদেশে খ্রিষ্টানদের বড়দিন, বৌদ্ধদের বুদ্ধ পূর্ণিমা, হিন্দুদের পূজা উদযাপন, মুসলমানদের ঈদ উদযাপনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমান গুরুত্ব দেয়া হয়। সমমর্যাদার কারণে সকল ধর্মীয় দিনগুলোতে রাষ্ট্রীয় ছুটি দেয়া হয় যা বর্তমান বিশ্বে বিরল। এদেশে ঈদ, পূজা, পার্বণ, বড়দিন, পূর্ণিমা একসাথে উদযাপন করার উদাহরণ রয়েছে। হিন্দুদের পূজার অনুষ্ঠানে মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধদের এবং মুসলমানদের ঈদ উদযপনে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধদের দাওয়াত দেয়ার রীতি রয়েছে। এমনকি হিন্দু-বৌদ্ধ, মুসলমান-খ্রিষ্টান স্ব-স্ব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে একে অন্যকে সাহায্য করার রীতি-নীতি প্রচলন রয়েছে। বিয়ে, মেলা, নবান্ন, হালখাতা অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় রীতি-নীতির সংমিশ্রন রয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন পর্যন্ত সকল ঘটনা প্রবাহে বিভিন্ন জাতি সত্ত্বার মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করেছে অর্থাৎ তাদের অংশগ্রহণ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলার বারো ভূইয়া হিসেবে পরিচিত হিন্দু-মুসলিম শাসকগণ যৌথভাবে মোঘল সৈন্যদের প্রতিরোধ করে বাংলার স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রেখেছিল। ব্রিটিশ শাসকরা এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতিতে বৈষম্য তৈরি করেছিল, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে ব্রিটিশদের দ্বিমুখী নীতি বাঙ্গালীদের কাছে উন্মেচিত হয়। পরবর্তী ইতিহাস সবারই জানা, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভ।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আরো দৃঢ় হয়েছে। স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্র গঠনের সময় কিছু দূর্বলতা থাকলেও ১৯৭৫ সালের পর থেকে সেই সমস্যাও কেটে যায়। যদিও বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে-সাথে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের জন্য বিভিন্ন সুবিধাবাদী গোষ্টি চক্রান্ত করে থাকে কিন্তু এদেশের অপামর জনগণ সেই প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে শুধু নিজ দেশে নয় বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন ভাবে আমাদের প্রশংসা করেছে। ’ধর্ম যার যার উৎসব সবার’- এই স্লোগানে উজ্জীবিত হয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি তৈরি হয়েছে সর্বত্র। নির্ভয়ে নিঃসঙ্কোচে এদেশের মানুষ যেভাবে ধর্ম পালন করতে পারে যা পৃথিবীর অন্য কোথাও সম্ভব নয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্টিসহ প্রান্তিক মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপসমূহ বিশ্বব্যাপি প্রশংসা কুড়িয়েছে। আমরা যাদের সভ্য জাতি হিসাবে মনেকরি সেই ইউরোপ-আমেরিকায়ও সাদা কালো দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। আমরা সবাই দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার কথা জানি, যিনি জাতিগত সম-অধিকারের জন্য যুদ্ধ করেছেন।

কিন্তু বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস মোটেও
সহজতর ছিল না যার প্রমাণ পাওয়া যায়, ইবনে বতুতার ভ্রমন বৃত্তান্তে। চর্তুদশ শতকে ইবনে বতুতা হিন্দু-মুসলমান পারস্পারিক সর্ম্পকের যে বর্ণনা দিয়েছেন- তা ছিল বিদ্বেষ, ঘৃনা, বৈরিতায় পূর্ণ। এছাড়া সুনীলগঙ্গোপাধ্যয়ের পূর্ব-পশ্চিম রচনায় আমরা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সুস্পষ্ট বর্ণনা দেখতে পায়। তারপরও হিন্দু-মুসলমান পারস্পারিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। হিন্দু-মুসলমান পারস্পারিক সম্পর্ক ছিল বিধায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু রমনী প্রমীলা দেবীকে বিবাহ করেছিলেন।

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে ধর্ম নিরপেক্ষতার সাথে শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ধর্ম নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী হওয়ায় সেই ধারা এখনও চলমান আছে। অস্বীকার করা যাবে না, ৬০ ও ৭০ দশকে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চেতনা যতটা শক্তিশালী ছিল বর্তমানে সেই ধারা আর বিদ্যমান নাই। কেননা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা আশংখাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। তবে আমরা বিশ্বাস করি এবং জোর দিয়ে বলতে চাই, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ট বা সংখ্যালুঘুদের মনে ধর্মীয় গোড়ামী বিদ্যমান থাকলেও রাষ্ট্রীয় নীতিতে ধর্মীয় নিরপেক্ষতার চর্চা করা হয়। যার নিদর্শন আমরা ২০২৪ সালে দেখতে পেয়েছি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের সাথে সাথে পুরনো শুকুনরা আবার তাদের ট্রাম কার্ড ব্যবহার করেছে অর্থ্যাৎ সংখ্যালুঘু সম্প্রদায়ের মন্দির, গীর্জায় হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। হাটহাজারীর কালী মন্দির, ফরিদপুরের রমিকৃষ্ণ মিশন, হবিগঞ্জের শ্রী শ্রী বুড়া শিববাড়ি মন্দির, চট্টগ্রামের নন্দীরহাট এলাকার মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে। এদের উদ্যেশ্য ছিল বাংলাদেশের বিরাজমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা এবং বহিঃবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা। কিন্তু দেশের ছাত্রসমাজ তাদের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে। সেই সময় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এমনকি সাধারণ জনতা রাত জেগে মন্দির পাহারা দেবার চিত্র আমরা বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেক্ট্র্রনিকস মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছি। আর বর্তমান সরকার সেই ধারা আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমরা মনে করি।

অমর হোক কাজী নজরুল-এর বাণী- গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি

লেখক:ব্যাংকার ও সমাজকর্মী
hmmaruf1991@gmail.com

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

বিনা অনুমতিতে ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও ব্যবহার করা কপিরাইট আইনের লংঘন ।

কারিগরি সহযোগিতায়- নাগরিক আইটি